বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম ২০২৬: ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ সংকট


রুবিন সাহেব পেট্রোল স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর বাইকে তেল ভরাতে হবে। সামনে দীর্ঘ লাইন। সব বাইকারা তেল নেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। এখন বাজে রাত ১০টা, টেলিভিশনে সংবাদ এসেছে, আজকের রাত ১২টার পর থেকে তেলের দাম ৩০ টাকা বাড়িয়ে দেয়া হবে। বেশ ভালো রকমের বিরক্ত তিনি। তাঁর সামনে থাকা বাইকার মেজাজে গজগজ করে বলে উঠলো, “সরকার শুধু পারে  জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে। অথচ জনগণের বেতন বাড়ে নাই এক পয়সাও, তার উপর আবার সরকারকে কর দাও, সবকিছু তাদের ষোল আনা  দরকার, কিন্তু দামটা বুঝি কমাতে পারে না? আমরা মধ্যবিত্তরা খাবো কি? আবার বলে যুদ্ধ লাগছে ইরান-আমেরিকার সাথে, তো যুদ্ধের প্রভাবে কি খালি বাংলাদেশেই পড়ছে  নাকি? সারা বিশ্বে নাই পরে নাই?”
কথাগুলো শুনে চুপ করে রইলো রুবিন সাহেব। কথাগুলো মিথ্যা না, আবার ফেলেও দেয়া যাচ্ছে না, Fact. সরকার কি আসলেই ব্যর্থ? নাকি বিশ্ববাজারেই তেলের বড় সংকট? বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম ২০২৬


রুবিন সাহেবের মনের প্রশ্নটা যদি আপনারও প্রশ্ন হয়ে থাকে, তাহলে আপনি একদম ঠিক জায়গায় এসেছেন। এ প্রতিবেদনে আমরা খুঁজে দেখার চেষ্টা করবো বিশ্ববাজারে তেলের সংকট, কারণ ও অর্থনৈতিক অবস্থা, যে সাথে বাংলাদেশের তেলের রিজার্ভ সেটার সমস্যা এবং  আসলে সরকার ব্যর্থ কিনা সেটারও দেখার  চেষ্টা করবো।


শুরুটা করি একদম ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে, যেদিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানের উপর আক্রমণ এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির মৃত্যুর কারনে একটি যুদ্ধে শুরু হয়েছে, এবং সে যুদ্ধ হরমুজ প্রণালীকে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জলপথে পরিণত হয়েছে। সেটির সমাধান না হতেই হুতিরা সেপ্টেম্বরে পেরিম  দ্বীপ ও ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল দখল করায়, আরেকটি সংকীর্ণ নৌপথ – বাব-এল-মান্দেব – ঝুঁকিতে পড়েছে।

যুদ্ধ শুরুর আগের দিন ক্রুড অয়েল ছিল ব্যারেল প্রতি $৭২। ৩০শে এপ্রিল এটির দাম বেড়ে যায় $১২৬ প্রতি ব্যারেল। বর্তমানে এটির মূল্য $১০৩.৬৭ প্রতি ব্যারেল, যা যুদ্ধ শুরুর আগের দিন থেকেও ৪৪% বেশি। এটি আমাদের হিসাব, কিন্তু এতক্ষনে নিশ্চয়ই মনে  প্রশ্ন জেগেছে কেন এ দুইটি প্রণালি এতটা গুরুত্বপূর্ণ? কেনই বা এ দুইটা প্রণালির কারনে তেলের দাম বেড়ে গেল?

 হরমুজ ও বাব-এল-মান্দেব,
হরমুজ আর বাব-এল-মান্দেব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তার মেইন কারণ হলো এ দুই প্রণালীর ভৌগোলিক অবস্থান।

IEA এর মতে, হরমুজ দিয়ে সাধারণত দিনে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল যায়, যা সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। বাইপাস করার জন্য যে পাইপলাইনগুলো ব্যবহার করা হয় তার শেষ হয়েছে লোহিত সাগরে, যার দক্ষিণ প্রবেশদ্বারে বাব-এল-মান্দেব। ১৩ বর্গ কিমির এ দ্বীপ প্রণালী-কে দুই ভাগ করেছে, প্রায় ৩ কি.মি চওড়া একটি খাল এবং প্রায় ২৫ কিমি চওড়া জাহাজ চলাচলের মূল পথ, হুতিরা মূল ভূখণ্ড ও পেরিম দ্বীপের ওপর প্রণালীর ইয়েমেনি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
ভৌগোলিক (Geography)
আপনি যদি মানচিত্রে লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখবেন ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী আরব উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সাথে যুক্ত করে

 ২০২৪-২৫  সালে এর ভিতর দিয়ে দিনে প্রায় ২০ mb/d অশোধিত তেল ও পরিশোধিত পণ্য গেছে, যা সমুদ্রপথের বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশ। এর ৩৩ কিমি চওড়া সরু জায়গা দিয়ে ২০২৫  সালে গেছিল ২০.৭  mb/d, যা ২৬ সালে শুরুতে এসে দাঁড়ায় ২৮.৬  mb/d


[বিকল্প পথ:

ইআইএ (EIA) সৌদি ও আমিরাতি পাইপলাইনে অব্যবহৃত ক্ষমতা ধরেছে প্রায় ২.৬ mb/d ; আইইএ (IEA) বলছে, ৩.৫–৫.৫ mb/d পাইপলাইন-ক্ষমতা দিয়ে তেল ঘুরিয়ে নেওয়া সম্ভব ; আল জাজিরার এক ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে উঠে আসে সর্বোচ্চ ধরেছে প্রায় ৯ mb/d তেল , যেখানে স্বাভাবিক সময়ে প্রণালী দিয়ে যায় প্রায় ২০ mb/d । সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম (East-West) পাইপলাইন লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল নেয়; ফলে এই বিকল্প আসলে পরের সংকীর্ণ নৌপথে গিয়ে ঠেকে ।

বাব এল-মান্দেব। “অশ্রুর দুয়ার” নামে পরিচিত এই প্রণালী প্রায় ৩২ কিমি চওড়া; ইয়েমেনকে জিবুতি ও ইরিত্রিয়া থেকে আলাদা করেছে। পেরিম দ্বীপ একে ভাগ করেছে প্রায় ৩ কিমি চওড়া পূর্ব খাল এবং আন্তর্জাতিক জাহাজের ব্যবহৃত প্রায় ২৬ কিমি চওড়া পশ্চিম খালে ;( FDD Long War Journal, 14 Sep 2026)। এখান দিয়ে তেল-প্রবাহ ২০২৩ সালে ছিল গড়ে ৯.৩ mb/d; হুথিদের জাহাজ-আক্রমণ অভিযানে ২০২৪ সালে নেমে আসে প্রায় ৪.১ mb/d-এ; আর সৌদি আরব লোহিত সাগরের টার্মিনাল দিয়ে তেল পাঠানোয় ২০২৬-এর জুনে তা ফের প্রায় ৭.৪ mb/d-এ পৌঁছায় । হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব একসঙ্গে বন্ধ হলে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।


২০২৬ সালে, সংকটের ক্যালেন্ডারঃ আমরা যদি ২৮ই ফেব্রুয়ারী থেকে,আজকের ঘটনাবলীর উপর গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে আমরা পুরো অবস্থাটা বুজতে পারব। তাই, পাঠকদের সহজে বুজার সুবিধার জন্য একটি টেবিল দেয়া হল।  

তারিখঘটনা
২৮ ফেব্রুয়ারিযুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা শুরু; নিহত হন সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি। জবাবে ইরান মার্কিন ঘাঁটি, উপসাগরীয় তেল-স্থাপনা ও জাহাজে আঘাত হানে  (Britannica, 2026)।
মার্চের শুরুইরান হরমুজ বন্ধ ঘোষণা করে; প্রণালী পারাপার প্রায় থেমে যায়  (CRS, Aug 2026)।
৩০ মার্চহুথিদের ইসরায়েলে প্রথম হামলার পর ব্রেন্ট $১১৫ ছাড়ায়; মার্চে দাম বাড়ে ৫৯%—১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় মাসিক উল্লম্ফন  (All India Radio, 30 Mar 2026)।
এপ্রিলপাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি বড় মাত্রার লড়াই থামায়  (CFR, Sep 2026)।
৩০ এপ্রিলব্রেন্ট $১২৬-এর ওপরে উঠে সর্বোচ্চে পৌঁছায়  (Al Jazeera, 2 Jul 2026)।
১৭ জুনহরমুজ খুলতে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা স্মারক সই হয়, পরে জাহাজের পথ নিয়ে ভেঙে পড়ে; ইরানি ট্যাংকার-হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আবার নৌ-অবরোধ আরোপ করে  (CNBC, 10 Aug 2026)।
২ জুলাইব্রেন্ট $৭১-এর নিচে নেমে যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে ফেরে  (Al Jazeera, 2 Jul 2026)।
৬–৭ জুলাইইরান তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালায়; যুদ্ধবিরতি টালমাটাল  (Britannica, 2026)।

জুলাইয়েই হুথিরা সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর অবরোধ ঘোষণা করে  (Britannica, Sep 2026)।
৬–৭ আগস্টহুথিরা ইয়েমেন সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় অভিযান শুরু করে  (FDD Long War Journal, 14 Sep 2026)।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কায় ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে  (Times of Israel, 17 Sep 2026)।
১০–১১ সেপ্টেম্বরহুথিরা মোখা দখল করে  (FDD Long War Journal, 14 Sep 2026)।

ইরাক থেকে ছোড়া ড্রোন সৌদি পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফলে তা বন্ধ হয়  (CNBC, 13 Sep 2026)।
১১–১২ সেপ্টেম্বরহুথিরা পেরিম (মায়ুন) নেয় এবং বাব এল-মান্দেব-সংলগ্ন লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ করে  (Al Jazeera, 12 Sep 2026; FDD Long War Journal, 14 Sep 2026)।
১১–১৩ সেপ্টেম্বরট্রাম্প সৌদি হামলা-অনুরোধ নাকচ করেছেন বলে জানা যায়  (Times of Israel, Sep 2026);

রিয়াদ সেন্টকমের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে  (Israel Hayom, 13 Sep 2026)।

১৩ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট $১০৫.৬৮-এ বন্ধ হয়  (CNBC, 13 Sep 2026)।
১৭–১৮ সেপ্টেম্বরসৌদি তেল হরমুজ ও ওমানের সোহার বন্দরের কাছে জাহাজ-থেকে-জাহাজ স্থানান্তরের মাধ্যমে পাঠানো হয়  (CNBC, 17 Sep 2026); ব্রেন্ট $১০৩.৮৭-এ স্থিত  (CNBC, 18 Sep 2026)।
২০–২১ সেপ্টেম্বরবাংলাদেশ চার ধরনের জ্বালানির দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায়  (The Business Standard, 20 Sep 2026)।


তেলের দামের ধাক্কা

এ পর্যায়ে এসে আমরা দেখবো বিশ্ববাজারে তেলের দাম ঠিক কিরকম ওঠানামা করছে।

তারিখব্রেন্ট, $/ব্যারেলযুদ্ধ-পূর্বের তুলনায়প্রসঙ্গ
২৭ ফেব্রুয়ারিপ্রায় ৭২প্রযোজ্য নয়যুদ্ধের আগের দিন  (CNBC, 21 Apr 2026)
৩০ মার্চ১১৫.৬৬+৬১%ইসরায়েলে হুথিদের প্রথম হামলার পর  (All India Radio, 30 Mar 2026)
৩০ এপ্রিল১২৬-এর ওপরে+৭৫%-এর ওপরেযুদ্ধোত্তর সর্বোচ্চ  (Al Jazeera, 2 Jul 2026)
২ জুলাই৭১-এর নিচেপ্রায় −২%আলোচনায় অগ্রগতি; দাম যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে  (Al Jazeera, 2 Jul 2026)
১০ আগস্ট৮৭.৭২+২২%হরমুজ-চুক্তি নিয়ে সংশয়; মার্কিন অবরোধ বহাল  (CNBC, 10 Aug 2026)
৭ সেপ্টেম্বরপ্রায় ৯৭+৩৫%হরমুজে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত  (Al Jazeera, 7 Sep 2026)
১৩ সেপ্টেম্বর১০৫.৬৮+৪৭%পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন বন্ধ  (CNBC, 13 Sep 2026)
১৮ সেপ্টেম্বর১০৩.৮৭+৪৪%সৌদি বিকল্প পথে আশঙ্কা কিছুটা কমেছে  (CNBC, 18 Sep 2026)


প্রথমত বাস্তব ভাবে দেখলে আপনার কাছে বর্তমান তেলের বাজার বেশ অস্থিতিশীল লাগবে। বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আজকের হিসেবে দেখলে তেলের দামের মেজর কোন পরিবর্তন হয়নি। বিশেষ করে ৩০শে এপ্রিল যা $১২৬ করে প্রতি ব্যারেল ছিল, তা আজ, ১৮ই সেপ্টেম্বর অনুযায়ী $১০৩.৬৭, তাও সৌদি আরবের বিকল্প পথ খুজে পাওয়াতে।


সৌদি আরবের উভয় সংকট


সৌদি আরবের সাথে হুতিদের চলছে এক বিস্তর যুদ্ধ। সাম্প্রতিক বাব-এল মান্দেব দখলের পর থেকেই হুতিরা একে একে দক্ষিণ সৌদি আরবে তেল স্থাপনা ও বিমান ঘাঁটিতে – খামিস মুশাইতে, আবহা ও জাজান এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়ে। হুতিদের দাবি তারা অন্য জাহাজ পারাপার করতে দিবে কিন্তু সৌদির গুলো নয়। সৌদি সরকার বর্তমান প্রণালীতে ট্যাংকার পাঠানো বিরত রেখেছে।


ওয়াশিংটনের অবস্থান:-
ট্রাম্প সরাসরি হামলায় অংশ নেননি বলে জানা যায়। হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তার মতে ইরানের সঙ্গে দুই মাসের যুদ্ধে মার্কিন-ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে গেছে। তবে হুতিরা যদি প্রণালীতে ক্ষেপণাস্ত্র বসায় তখন ওয়াশিংটন হাত দিবে।


মিত্র জোট, যা কোন কাজে আসে নি:
সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান মিলে প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম পরীক্ষা ছিল এটি। অথচ, তুরস্ক ও পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের মত সৌদি নাকি কোন সাহায্য চায়নি।


ইসরায়েল পথ:- ইসরায়েলি গণমাধ্যমের [?] খবর অনুযায়ী সৌদি এ যুদ্ধে ইসরায়েলের সাহায্য নিতে পারে। বিশেষ করে গোয়েন্দা ও অন্যান্য সহযোগিতা চাওয়া রয়েছে যদিও রিয়াদ এ ব্যাপারে কিছু বলে নি,


বাংলাদেশের অবস্থান, সমস্যা ও সমাধান:-


বাংলাদেশে বর্তমানে তেলের দাম বাড়ছে। ডিজেল ১৩৫ টাকা করে, অকটেন ১৬৫  টাকা করে, পেট্রোল ১৬০  করে, এবং কেরোসিন ১৫৫ করে। কিন্তু তেলের দাম কি বর্তমান সরকারের সময়ে বেড়েছে? নাকি  পূর্ববর্তী সরকারের আমলেও বেড়েছে? উত্তরটা জানার জন্য আমাদের কিছু ডাটা প্রয়োজন,


প্রথমত বাংলাদেশ ৯৫% তেল আমদানি করে। দেশে ডিজেল, অকটেন উৎপাদিত হলেও তা তো খুবই কম । সুতরাং বৃহৎ অংশে দেশের বাইরে থেকে তেল আমদানি করতে হয়। ফেব্রুয়ারির যুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে, ২১শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের তেলের দামের একটা ধারনা দেয়া হলো।

পণ্যফেব্রুয়ারি ২০২৬ (যুদ্ধ-পূর্ব)১৯ এপ্রিল ২০২৬জুন–আগস্ট ২০২৬২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ফেব্রুয়ারির তুলনায় পরিবর্তন
ডিজেল১০০১১৫১১৫১৩৫+৩৫ (+৩৫%)
অকটেন১২০১৪০১৪৫১৬৫+৪৫ (+৩৭.৫%)
পেট্রোল১১৬১৩৫১৪০১৬০+৪৪ (+৩৮%)
কেরোসিন১১২১৩০১৩৫১৫৫+৪৩ (+৩৮%)


টেবিলটি দেখলে বুঝা যায় কিভাবে ধাপে ধাপে তেলের দাম বাড়ছে। তবে তেলের দাম যে শুধু এ বছরেই বেড়েছে তা নয়। কেন এ কথা বলছি? তার উত্তর আওয়ামীলীগ সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ও তেলের দাম বেড়েছিল। আসুন আমরা শুধু ডিজেলের একটা চার্ট দেখি।

Chart of retail diesel price


২০০৯  এ  হাসিনার সরকারে ডিজেল ৪৪/ টাকা/লিটার রাখলেও  ২০২৪ এ সেটি ১০৬/ লিটার হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সেটি ১০০ টাকা/লিটার করে। বর্তমানে বিএনপির সময়ে এটি ১৩৫ টাকা/লিটার।
এখন  আমরা যদি অকটেন আর পেট্রোলের দিকে তাকাই, তাহলে হিসাবটা আরেকটু পরিষ্কার হয়।


Chart of retail octane price

Chart of retail petrol price


উপরের চার্ট ৩টি দেখে আখন হয়তো বুজতে পেরেছেন দেশের তেলের দাম আসলে ঠিক কীভাবে বেড়ে চলেছে।

আপনার যদি মনে হয় কেন বাংলাদেশে কেন তেল সংকট, তার মূল কারণ নিয়ে আসুন একটু ঘাটাঘাটি করি।


① বাংলাদেশের প্রকৃত কৌশলগত মজুদ নেই। বাংলাদেশের তেল নিয়ে যতটুকু মজুদ থাকার জন্য ব্যবস্থা থাকার দরকার তা নেই। বাংলাদেশের চলে running Inventory পদ্ধতিতে।


② ২০২৫-২৬ মতে আমদানিকৃত তেলের ৬০% আসছে UAE, ইরাক ও সৌদি থেকে, বাংলাদেশ ৯৫%  তেল ও ৩০% গ্যাস আমদানি করে। একমাত্র  রিফাইনারি বছরে ১৩ লাখ টন আমদানিকৃত তেল প্রক্রিয়া করে। সমস্যা হলো এটি ভারি তেল সামলাতে পারে না।


③ বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ও বার্তায় অসঙ্গতি ফুটে ওঠে। তারা যতবারই বলে তেলের ঘাটতি নেই, ততবারই এক উল্টো চিত্র ফুটে ওঠে। দেখা যায় যে এমন একটা চিত্র যেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বললেন “আমাদের তেলের সংকট নেই, কিন্তু রাত হলে পেট্রোলপাম্প গুলোতে ভিড় বাড়ে,


④২০২৪-এর ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল প্রতি মাসে বৈশ্বিক দাম প্রতিফলিত করা । বাস্তবে দাম আটকে থেকেছে আর লোকসান জমেছে; পরে ধাপে ধাপে বেড়েছে—এপ্রিলে, যখন ব্রেন্ট নেমে প্রায় $৯০-এ, আর এক বিরোধী নেতা সময় নিয়ে সমালোচনা করেছেন  এবং এখন একসঙ্গে ২০ টাকা। ঘোষিত ও ধাপে ধাপে সমন্বয়ের সূত্র ভোক্তা ও বিপিসি—দুই পক্ষের জন্যই বেশি ন্যায্য হতো।


⑤ভঙ্গুর জ্বালানি-মিশ্রণ। নবায়নযোগ্য উৎসের অবদান বিদ্যুৎ-উৎপাদনের প্রায় ৫.২৫–৫.৪০%; নীতিগত লক্ষ্য ২০৩০-এ ২০% ও ২০৪০-এ ৩০%  । এলএনজি-ঘাটতি সরাসরি সার ও পোশাকশিল্পকে আঘাত করেছে  ।

যা কাজ করেছে। সরকার ভারত থেকে মৈত্রী পাইপলাইনে বাড়তি ডিজেল এনেছে, রাইড-শেয়ারিং চালকদের জন্য মোটরসাইকেলের জ্বালানি-কোটা বাড়িয়েছে এবং মজুতদারি ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত নামিয়েছে । সংকট খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটিও গঠিত হয়েছে ।

কীভাবে সমাধান: ধাপে ধাপে রূপরেখা

নিচের সারণিতে বাংলাদেশি ও আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব এবং আমাদের নিজস্ব পরামর্শ একত্র করা হয়েছে; নিজস্ব পরামর্শ আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সময়করণীয়যুক্তি ও প্রমাণ
এখনই (০–৩ মাস)প্রতিদিনের মজুত-দিন ও আমদানি-সূচি প্রকাশ; মজুতদারিবিরোধী অভিযান এবং জরুরি ব্যবহারকারীদের (কৃষক, গণপরিবহন, গিগ রাইডার) জন্য নিবন্ধনভিত্তিক কোটা।আতঙ্কিত ক্রয় কয়েক দিনে ডিজেলের চাহিদা দ্বিগুণ করেছিল  (The Daily Star, Mar 2026)।
এখনই (০–৩ মাস)সবার জন্য ভর্তুকির বদলে সেচ, পণ্য-পরিবহন ও গণপরিবহনে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা; ঘোষিত মাসিক সমন্বয়-সীমা ও ছোট একটি স্থিতিশীলতা তহবিল (আমাদের প্রস্তাব)।বিশেষজ্ঞেরা জ্বালানি-ভর্তুকি ধাপে ধাপে কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
৩–১৮ মাসকৌশলগত মজুত গড়া: বেসরকারি অব্যবহৃত সংরক্ষণাগার ভাড়া নিয়ে ডিজেল, হেভি ফুয়েল অয়েল ও কয়লা মজুত; মজুত-দিনের লক্ষ্য নির্ধারণ (আমাদের পরামর্শ: প্রথম ধাপে অন্তত ৩০ দিনের ডিজেল)।সংরক্ষণাগার ভাড়া ও মজুতের প্রস্তাব দিয়েছেন একজন বাংলাদেশি জ্বালানি-নির্বাহী; সিপিডি বড় মজুতের তাগিদ দিয়েছে ।
৩–১৮ মাসসরবরাহকারী ও পথের বহুমুখীকরণ: সিঙ্গাপুর, ভারত, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য; স্পট বাজারের বদলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি; উপসাগরের বাইরে থেকে আরও এলএনজি।বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব, আমিরাত, কুয়েত ও কাতার থেকে কেনে ; ২০২৫ সালে ভারত প্রায় ১.২২ লাখ টন ডিজেল দিয়েছে  (The Daily Star, Mar 2026); একাধিক অঞ্চল থেকে এলএনজি সংগ্রহ করে বাংলাদেশ (S&P Global, 3 Apr 2026)।
৩–১৮ মাসআমদানিকৃত জ্বালানির (এলএনজি, কয়লা, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল) ওপর সাময়িক কর-ছাড়, ক্রয়-ব্যয় কমাতে।শিল্প-নেতারা প্রস্তাব করেছেন এ বিষয়টি (S&P Global, 3 Apr 2026)।
২–১০ বছরবঙ্গোপসাগরসহ দেশীয় গ্যাস-অনুসন্ধান বাড়ানো; ২০৩০-এর মধ্যে নবায়নযোগ্য ২০%-এর দিকে যাওয়া; আঞ্চলিক জলবিদ্যুৎ আমদানি; ভারী অশোধিত তেল প্রক্রিয়ার জন্য শোধনক্ষমতা উন্নত করা (আমাদের পরামর্শ)।নীতিগত লক্ষ্য ও ঘাটতি  (The Financial Express, 13 Apr 2026);

অনুসন্ধান ও জলবিদ্যুৎ আমদানি  (S&P Global, 3 Apr 2026);

শোধনাগারের সীমাবদ্ধতা  (The Daily Star, Apr 2026; The Daily Star, Mar 2026)।
২–১০ বছরপ্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা এবং বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।সহনশীলতা নির্ভর করে বহুমুখীকরণের পাশাপাশি স্থিতিশীল আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের ওপর  (ORF, 16 Apr 2026); এপ্রিলের চলাচল-অস্বীকৃতি  (The Financial Express, 13 Apr 2026)।

দৃশ্যকল্প ও সামনের পথ

নিচের পরিসরগুলো আমাদের বিশ্লেষণাত্মক বিচার, পূর্বাভাস নয়। পরিস্থিতি কীভাবে তেলের দাম নাড়াতে পারে এবং ঢাকার জন্য তার অর্থ কী—তাই দেখানো হয়েছে।

দৃশ্যকল্পলক্ষণ (signposts)ব্রেন্ট (আনুমানিক)বাংলাদেশের জন্য অর্থ
ক. উত্তেজনা-হ্রাস১৩ সেপ্টেম্বর স্থগিত ওমানে উপসাগরীয়–ইরান বৈঠক আবার নির্ধারিত হয়  (CNBC, 13 Sep 2026);

যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি; পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন অর্ধেক প্রবাহে ফেরে  (Trading Economics, 18 Sep 2026);

হুথিরা পেরিমেই থামে।
$৮০–৯৫বিপিসির চাপ কমে; আরও মূল্যবৃদ্ধি স্থগিত রাখার সুযোগ।
খ. টানাপোড়েনের অচলাবস্থা (মূল ধারণা)অবরোধ চলে, বিচ্ছিন্ন হামলা, হরমুজে আংশিক প্রবাহ, সৌদি বিকল্প পথ  (CNBC, 17 Sep 2026; CNBC, 18 Sep 2026)।$৯৫–১১৫, অস্থিরআরও মাসিক সমন্বয়ের সম্ভাবনা; ডিজেলে লিটারে প্রায় ৬৯ টাকার ব্যয়-ব্যবধান থেকে যায় (আমাদের অঙ্ক)  (bdnews24, 20 Sep 2026)।
গ. দ্বিমুখী নৌপথ-ধাক্কাপেরিমে হুথি লঞ্চার বা রাডার মার্কিন হামলা ডেকে আনে  (Israel Hayom, 13 Sep 2026),

বাব এল-মান্দেব আরও বন্ধ হয়; দুটি প্রণালী একসঙ্গে বন্ধ হলে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ তেল ও গ্যাস ঝুঁকিতে  (The National, 24 Jul 2026)।
$১২০-এর ওপরে, হঠাৎ লাফসহঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, এলপিজি ও এলএনজির সংকট, রেশনিং ফেরা।

নজরে রাখার লক্ষণ: উপসাগরীয়–ইরান আলোচনার নতুন তারিখ; পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন মেরামত; পেরিমে ক্ষেপণাস্ত্র-লঞ্চার বা রাডার মোতায়েন; হরমুজে দৈনিক জাহাজ-চলাচল; এবং ট্রাম্পের পুনরায় উত্তেজনা বাড়ানোর ঘোষিত বিকল্প।

উপসংহার

এই সংকট ব্যাখ্যা করে ভূগোল: বিশ্বের তেল যায় সরু নৌপথের এক শৃঙ্খল দিয়ে, আর ১৩ বর্গকিমির একটি দ্বীপ একটি বিশাল তেলক্ষেত্রের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এর আকার ব্যাখ্যা করে রাজনীতি: ইরান ও তার মিত্ররা নৌপথকে দর-কষাকষির হাতিয়ার করছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন ফ্রন্ট খুলতে অনিচ্ছুক, আর রিয়াদ এমন অংশীদারদের মধ্যে হেজিং করছে যাদের ওপর পুরোপুরি ভরসা করা যায় না। বাংলাদেশের জন্য সংকট পুরোনো দুর্বলতা উন্মোচন করেছে: পাতলা মজুত, কেন্দ্রীভূত সরবরাহকারী, একটিমাত্র প্রাচীন শোধনাগার, আর সবচেয়ে দরকারের সময় সরিয়ে রাখা একটি মূল্য-সূত্র। ডিজেলে ১৩৫ টাকা হয়তো গল্পের শেষ নয়, কারণ রাষ্ট্রীয় আমদানিকারক এখনো ব্যয়ের নিচে বিক্রি করছে। যে দেশ মজুত করে, উৎস বহুমুখী করে এবং জনগণের সঙ্গে সৎভাবে কথা বলে, পরের ধাক্কায় তার মূল্য কম দিতে হবে।

আরও পড়ুনঃ ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ ২০২৬: কে জিতছে, কে হারছে?

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *