ভারত কি মুসলিম বিরোধী? হিন্দুত্ববাদ ও RSS-BJPর আসল ইতিহাস। Is India Anti- Muslim?

কিভাবে ভারতীয় পলিসিটা মুসলিমকেন্দ্রিক হয়ে গেল?

ভারত কি মুসলিম বিরোধী? কল্পনা করুন, আপনি ভারতের কোনো একটি রাজ্যের নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করছেন। আপনার সামনে সে এলাকার জনগণ দাঁড়িয়ে আছে,। তারা সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে মঞ্চে দাঁড়ানো বক্তার বক্তব্য শুনছে ।  বক্তা বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি শুনিয়ে যাচ্ছে। আপনার চারপাশের ভিড়ে থাকা জনতা সব শুনছে।  আপনি নিজেও সে বক্তব্য শুনলেন, সেই মুহূর্তে বক্তা বলে উঠলেন —

“যদি তার সরকার নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসে, তাহলে মুসলমানদের সব অবেধ-স্থাপনা উচ্ছেদ করে দিবো।” করতালিতে ফেটে পড়লো পুরো সমাবেশ।  কিন্তু আপনার মাথায় ঠিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, “কেন শুধু মুসলমানদের অবেধ স্থাপনা?”

অবেধ -স্থাপনা তো হিন্দুরাও করতে পারে, অন্য জাতের লোকেরাও করতে পারে,আবার চাইলে তিব্বতীয়ও করতে পারে,, বৌদ্ধ বর্ণের অনুমতিরও করতে পারে। তাহলে ওকে বাদ দিয়ে শুধু মুসলমান কেন?” আপনি যখন এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে যাবেন, তখন আপনি ভারতীয় politics-কে নতুন রূপে দেখবেন।

ভারত কি মুসলিম বিরোধী?

এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমাদের দেখতে হবে বর্তমান ভারতের রাজনীতি ঠিক কিভাবে উগ্র ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। এটা বুজতে পারলে আমরা বাকিটাও  আমরা বাকিটা বের করতে পারবো।

ভারতে বর্তমান রুলিং পার্টি BJP কিন্তু হুট করে কোনো পলিটিক্যাল পার্টি হয়নি, বরং এটি একসময় ভারতের এক প্রাচীন ও বর্তমানে অবস্থিত RSS-এর রাজনৈতিক শাখা। এই RSS তাদের স্বপ্ন ও আদর্শ নিয়ে কাজ করে। যার নাম “হিন্দুত্ববাদ”। এ হিন্দুত্ববাদ আদি ভাবনা মূলত এসেছে একজন ব্যক্তির হাত ধরে। যার নাম বিনায়ক দামোদর সাভারকর। যিনি নিজে একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন। ১৯২৩ সালে তার “Essentials of Hindutva” প্রকাশিত হয়। সে বইয়ে মূল ভাবধারা হলো ভারতকে একটি মাত্র হিন্দুদের জন্য নির্দিষ্ট ভূমি এবং পুণ্যভূমি বলা। সাভারকর তার বইয়ে ভারতের মানচিত্র সীমানাকে বিকল্পভাবে বর্ণনা দিয়েছিলেন —

“হিন্দুস্থানের সীমানা সিন্ধু নদী থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত।”

যদি বর্তমান ভৌগোলিক সীমানার দিকে তাকান, তাহলে সিন্ধু নদী বর্তমান পাকিস্তানে রয়েছে। তার মানে ভারত মহাসাগর অবধি যদি হয়, তাহলে এতে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান উভয়ই এ সীমানার আলোকে পড়ে গিয়েছে।

১৯৩০ ও ১৯৪০ সালে, দেশভাগের পূর্বে, হিন্দু মহাসভার সভাপতি হিসেবে সাভারকর “অখণ্ড হিন্দুস্থান” স্লোগানটি আন্তর্জাতিকভাবে বদ্ধ করেন। তিনি মুসলিমদের “অস্পৃশ্য” বলে অভিহিত করেন।

RSS-এর উত্থান

মুসলিম বিরোধী রাজনীতির কারনে RSS কে সবাই জানে। কিন্তু শুরুতে এটি এমন ছিল না। ১৯২৫ সালে ২৭শে বিজয়া দশমীর দিনে বিশ্বনাথ কেশব হেডগেওয়ার ভারতের মহারাষ্ট্রের নাগপুরে “রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ” বা RSS-এর প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন নাগপুরের একজন চিকিৎসক এবং একইসাথে একজন জাতীয়তাবাদী।

RSS প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দুদের মধ্যে ঐক্য, সংহতি ও তাদের আচার-রীতিকে জাগ্রত করা।

RSS প্রতিষ্ঠার পর সেটার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে।  এ প্রতিষ্ঠানটির কিন্তু কোন লক্ষ্য ছিল না  রাজনীতিতে আসার। কিন্তু ১৯৪৮ সালে জানুয়ারির ৩০ তারিখে মহাত্মা গান্ধীর হত্যার মাধ্যমে RSS-কে নিষিদ্ধ করা হয়। বলা হয় মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গোডসে একজন প্রাক্তন RSS কর্মী ছিলেন। এ হত্যার পটভূমিতে ভারতীয় সরকার RSS-কে ব্যান ঘোষণা করে এবং সহস্র সংঘের নেতাকে জেলে ঢুকানো হয়। মেয়াদে RSS-এর প্রবীণ নেতারা বুঝতে পারেন, রাজনৈতিক ক্ষতি ছাড়া তারা টিকিট পাবেন না।

যার ফলে ১৯৫১ সালে তারা স্বতন্ত্র রাজনীতিতে না জড়িয়ে “সংঘ পরিবার” নামে একটি কৌশল নিয়ে মাঠে নামে। তারা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জিকে সঙ্গে নিয়ে “ভারতীয় জনতা সংঘ”  এ নামে মাঠে নামে। পরবর্তীতে — এটি “ভারতীয় জনতা পার্টি” নামে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি RSS-এর প্রাক্তন সদস্য।

RSS ও অখণ্ড ভারত

যদিও অখণ্ড ভারতের মূল আদর্শিক নায়ক সাভারকরকে দেখা হয়, কিন্তু বর্তমানে RSS সে জায়গাটাকে অন্য দিকে নিয়ে গিয়েছে।  তারা অখণ্ড ভারতকে নিজেদের স্বার্থ ও লক্ষ্যের জন্য মিলিয়ে নকশা পরিবর্তন করছে। ফলে যেসব সাভারকরের নকশায় ছিল আফগানিস্তান, ভারত আর বাংলাদেশ নিয়ে, RSS সে মানচিত্র কল্পনাকে বড় করে তুলে।

তৎকালীন RSS-এর দ্বিতীয় প্রধান এম.এস. গোলওয়ালকরের নেতৃত্বে নতুন মানচিত্র তৈরি করা হয়, যেখানে আফগানিস্তান, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, তিব্বত ও শ্রীলঙ্কাকেও নিয়ে আসা হয়। যার ফলে বর্তমান RSS-এর চিন্তায়, কার্যক্রমে বা এ মানচিত্র তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

হিন্দুত্ববাদ ও RSS সংগঠনের প্রতীকী চিত্র

১৯৮০ সালে RSS তার সমর্থক নেটওয়ার্ক দিয়ে ভারতের বিখ্যাত বাবরি মসজিদ ঘেঁষে মন্দির ধ্বংস স্থাপনার দাবি তুলে। তাদের মতে বাবরি মসজিদের জায়গায় ছিল রামের মন্দির। মোঘল সুলতানরা এই জায়গায় মন্দির ভেঙে মসজিদ বানায়। যার ফলে ১৯৯২ সালে সেবক থেকে হাজার হাজার RSS কর্মী ও জনতা নিজেদের হাতে শাবল, হাতুড়ি আরও নানাভাবে মসজিদ ভেঙে ফেলে। এ ঘটনা দিনভর চলে

বাবরি মসজিদ ধ্বংস – সম্পাদকীয় প্রতীকী চিত্র

বলাই বাহুল্য, সে হামলাতে তৎকালীন প্রশাসন তেমন বাধা দেয়নি, বরং সে সময় উত্তর প্রদেশের নেতা ছিলেন কল্যাণ সিং, যিনি কিনা একজন সিনিয়র BJP নেতা।

তদন্ত প্রতিবেদন ,  যা ২৭ বছর পরে সামনে আসে ,  এ ঘটনাকে “স্বেচ্ছাকৃত ধ্বংসলীলা বলা হয়।” বর্তমানে সেখানে নতুন রূপে নির্মিত রাম মন্দির রয়েছে।

মিডিয়া Propaganda এবং সিনেমা

আপনি যদি মনে করেন ভারতের রাজনীতি এতটা সীমাবদ্ধ, তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। রাজনীতিতে মানুষের চিন্তাধারাকে পরিবর্তন করে মিডিয়া। আর যে মিডিয়া প্রচার করে মুসলিমরা বিপদজঙ্ক, , মুসলিমদের উচিত পাকিস্তানে চলে যাওয়া, তখন বুঝতে হয় মিডিয়া তার ক্ষমতা গদির কাছে হস্তান্তর করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় মিডিয়া অসংখ্য ভাবে মুসলিম বিরোধী মতবাদ প্রচার করছে। যে মাত্রায় বেড়েছে মুসলিম বিদ্বেষী চলচ্চিত্র। The Kerala Story, The Kashmir Files, আরো নানা মুভি সমসাময়িক মুসলিমদের হেয় করছে। বলা যায় ভারতে মুসলমানদের জন্য খারাপ সময় অপেক্ষা করছে।

, সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভারতীয় মুসলিমদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া, তাদের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে, সরকারি সহায়তা কমিয়ে দেয়া, ভারতের মুসলিমদের অভাবী কোণঠাসা করা।

এমনও দেখা যায় মুসলিমরা আযান দিতে গেলে কোনো কারণেই বাধা দেওয়া, মসজিদে আযান দেয়া বন্ধের নির্দেশ করা, মসজিদের নিচে  “মন্দির আছে” তার বলে উস্কানি দেয়া তো আছে। সে সাথে উত্তর প্রদেশে মুসলিমদের  বাড়িঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য ভেঙে দেয়ার বিভীষিকা কেবল অনেকবার শিরোনামে উঠেছে।

বাংলাদেশ – ভারতের রাজনীতি

শুরুতে শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে বাংলাদেশের সাথে ভারতের বেশ ভালো ধরনের সম্পর্ক ছিল। যে সম্পর্ককে বাংলাদেশের অনেক বিশ্লেষক “স্বামী-স্ত্রীর” সম্পর্ক বলেও উল্লেখ করত। বিশ্লেষণ করলে হাসিনার একটা উক্তি সবসময়ই সামনে আনা হয়, আর সেটা হলো — “আমরা ভারতকে যা দিয়েছি, তা তারা সারা জীবন মনে রাখবে।”

তবে বাংলাদেশের মানুষ হাসিনা সরকারের আমলে দিনদিন ভারত-বিরোধী হয়ে উঠেছিলো। ধীরে ধীরে ভারত-বিরোধী ও সরকার-বিরোধী করার পিছনে বেশ কিছু ঘটনা সামনে চলে আসে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা:

  • বিডিআর হত্যাকাণ্ড (ফেব্রুয়ারি ২৫-২৬, ২০০৯)
  • সাগর-রুনি হত্যা (ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১২)
  • ইলিয়াস আলীর গুম (১৭ই এপ্রিল ২০১২)
  • বিশ্বজিৎ দাস হত্যা (৯ই ডিসেম্বর ২০১২)
  • শাপলা চত্বর সমাবেশ (৫-৬ই মে ২০১৩)
  • আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড (৬ই অক্টোবর ২০১৯)

তদ্ব্যতীত হাসিনা আমলে গণতান্ত্রিক অগ্রগতির ঘাটতি, ত্রুটিযুক্ত নির্বাচনের সময় ভোট-জালিয়াতি (২০১৮ ও ২০২৪), কোটা আন্দোলনের প্রথম ধাপ এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলন (২০১৮) জনগণকে ধীরে ধীরে সরকার-বিরোধী চিন্তায় ঠেলে দেয়। তার মধ্যে যুক্ত হয় ভারতকে অতি স্বার্থপর দেখার মতবাদ।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রতীকী চিত্র

তারই মধ্যে বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি হয় যা নিয়ে এখনো লোকমুখে চলছে । বেশ কিছু ছুক্তি নিয়ে আমরা এখন কথা বলব

 ট্রানজিট সুবিধা রেলওয়ে ট্রানজিট (২০২৪)

  • ভারত যা পেয়েছে: ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার শেষ ভারত সফরের সময় একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়। এর মাধ্যমে ভারতীয় ট্রেনকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে (যেমন- আসাম, ত্রিপুরা) সরাসরি যাওয়ার রেল ট্রানজিট দেওয়া হয়। এটি ভারতের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল “শিলিগুড়ি করিডোর” বা “চিকেনস নেক”-এর ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে এবং তাদের যাতায়াতের সময় ও খরচ বাঁচিয়েছে।
  •  

বাংলাদেশ যা হারিয়েছে: সমালোচকদের মতে, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। বাংলাদেশ পুরো অবকাঠামোগত ও নিরাপত্তার ঝুঁকি নিলেও নেপাল বা ভুটানের সাথে বাণিজ্য করার জন্য ভারতের কাছ থেকে কোনো পারস্পরিক ট্রানজিট সুবিধা (Reciprocal Transit) পায়নি। (যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ চুক্তি বাতিল করে)

. চট্টগ্রাম মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুবিধা (২০১৯)

  • ভারত যা পেয়েছে: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে সহজে মালপত্র নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে তাদের চট্টগ্রাম মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের অবাধ অনুমতি দেওয়া হয়। এমনকি এই মালামাল পরিবহনের জন্য ট্রানজিট ফি-ও নামমাত্র রাখা হয়েছিল।
  • বাংলাদেশ যা হারিয়েছে: বাংলাদেশের নিজস্ব আমদানিকারকদের এমনিতেই বন্দরের ধারণক্ষমতার অভাবে পণ্য খালাসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এর মধ্যে ভারতকে বন্দর ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ায় স্থানীয় ব্যবসা ও সড়ক যোগাযোগে তীব্র জট সৃষ্টি হয়, যার বিপরীতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কোনো উল্লেখযোগ্য রাজস্ব পায়নি।

. ফেনী নদীর পানি চুক্তি বনাম তিস্তা সংকট (২০১৯)

  • ভারত যা পেয়েছে: ২০১৯ সালের চুক্তির মাধ্যমে ভারতকে ত্রিপুরার সাবরুম শহরে খাওয়ার পানি সরবরাহের জন্য ফেনী নদী থেকে .৮২ কিউসেক পানি প্রত্যাহারের অনুমতি দেওয়া হয়।
  • বাংলাদেশ যা হারিয়েছে: এই চুক্তিটি দেশের মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। কারণ, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের অনড় অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিস্তার পানির অভাবে উত্তরবঙ্গের লাখ লাখ কৃষক প্রতি বছর খরায় ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, অথচ বাংলাদেশ ফেনী নদীর পানি ভারতকে দিয়ে দেয়।

. আদানি পাওয়ার চুক্তি (২০১৭)

  • ভারত যা পেয়েছে: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB) ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করে।
  • বাংলাদেশ যা হারিয়েছে: জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই চুক্তিকে “অত্যন্ত বৈষম্যমূলক ও একতরফা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ ব্যবহার না করলেও আদানিকে বিপুল পরিমাণ “ক্যাপাসিটি চার্জ” এবং কয়লার চড়া দাম দিতে বাধ্য থাকে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের ওপর বিশাল আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

. উপকূলীয় নজরদারি রাডার সিস্টেম (২০১৯)

  • ভারত যা পেয়েছে: বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে ২৪টি উপকূলীয় নজরদারি রাডার সিস্টেম স্থাপনের জন্য ভারতের সাথে একটি চুক্তি সই হয়।
  • বাংলাদেশ যা হারিয়েছে: এর মাধ্যমে ভারতের সামরিক বাহিনী বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ওপর সরাসরি নজরদারির ক্ষমতা পায়। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা স্বায়ত্তশাসন ভারতের কাছে সমর্পণ করার শামিল।

. ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী দমন (২০০৯)

  • ভারত যা পেয়েছে: ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই হাসিনা সরকার বাংলাদেশের মাটিতে আশ্রয় নেওয়া ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন- উলফা বা ULFA) দমনে ব্যাপক অভিযান চালায় এবং তাদের শীর্ষ নেতাদের ভারতের হাতে তুলে দেয়।
  • বাংলাদেশ যা হারিয়েছে: এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সম্পূর্ণ শান্ত ও নিরাপদ হয়ে উঠলেও ভারত এর বিনিময়ে সীমান্তে বিএসএফ (BSF) কর্তৃক নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি করে হত্যা বন্ধ করেনি, কিংবা তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান করেনি।

    বেশ কিছু চুক্তি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাতিল করে।

    এছাড়াও ভারত অর্থনীতির দিক দিয়ে কিভাবে দক্ষিণ এশিয়াতে রাজত্ব করার পথে এগিয়ে আছে, সেটা আমরা আমাদের এ আর্টিকেলে দেখিয়েছিঃ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক যুদ্ধ: বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ তিক্ত অবস্থায় রয়েছে। এর কারণও আছে।

প্রথমত, বিগত ১৭ বছরে হাসিনা সরকারকে একতরফা ভাবে ভারতকে সুবিধা দেয়া নীতি বাংলাদেশের মানুষকে প্রতিনিয়ত ক্ষুব্ধ এবং ভারত-বিরোধী করে তুলেছে। যার ফলস্বরূপ বাংলাদেশের মাঝে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে। দুই দেশের জনগণের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়াতে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশকে হেয় করে দোষ, গালাগালি, বাংলাদেশে হিন্দুদের গণহত্যা করে মেরে ফেলা, বাংলাদেশকে মৌলবাদীদের আতুরঘউর বলা, সহ হাজারো প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে।

যে সময় যুক্ত হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও হাসিনাকে ফেরত আনার কথা। বলাই বাহুল্য, এ জায়গায় হাসিনাকে ভারত থেকে না আনলেও, ভারতের সাথে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক খুব তিক্ত ভাবে চলছে।

বিশ্লেষণ করলে BNP-র মতাদর্শ সর্বসময় ভারত-বিরোধী এজেন্ডা পোষণ করে। বেগম খালেদা জিয়া তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মাত্র ২ বার ভারত ভ্রমণ করেছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও একই মতাদর্শ বহন করেন। দেশ-বিদেশে এই মতাদর্শ ক্যারি করছেন তারেক রহমান।

যেমন গত ৫ই অগাস্ট — সেসময় হাসিনাকে ভারত বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়ায় কড়া ভাষায় ভারতকে জবাব দিয়েছিল বাংলাদেশ। যা ভালোভাবে নেয়নি ভারত। আবার একই সালে ১২ তারিখে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে ফোন করে আমন্ত্রণ জানায়, কিন্তু তারেক রহমান তা ফিরিয়ে দিয়ে দেন। তার বিনিময়ে  ভারতকে তিনি শর্ত দেন।

১) বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দি বিনিময় চুক্তি আছে। সে চুক্তির মোতাবেক, হাসিনাকে ফেরত দেয়া।

৪) শহীদ উসমান শরীফ বিন হাদির  হত্যাকারিদের ফেরত দেয়া।

যদিও ভারত একটা শর্তও এখনো মানে নি। বিশেষ করে, মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশ জয়েন হওয়া নিয়ে রীতিমতো ভারতের মিডিয়ার কাঁদা ছুঁড়াছুঁড়ি আছেই।

শেষ কথা

ভারতের বর্তমান মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাজনীতি বেশ আত্মঘাতসূচক। সেই আত্মঘাতসূচক বাংলাদেশের মাঝে তাদের অবস্থানও। খুব সুদূর ভবিষ্যতে এ সম্পর্ক ভাল করতে হলে সবার আগে ভারতকে এটাই মাথাই রাখতে হবে, বাংলাদেশ আর আগের মত “ শুধু দিয়ে যাওযা ,বিনিময়ে কিছুই না নেয়া “ অথবা “ স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক” চায় না। তারা পারস্পরিক সমান সম্পর্ক ছায়। যেটা ভারত দিতে পারি নি এখনও । তবে ভারতের বর্তমান রাজনীতি যে উপমহাদেশে মুসলিমদের উপর যে প্রভাব ফেলছে তা অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে ভারতীয় মুসলিমদের উপর।

আরও পড়ুনঃ Cultural Warfare, Soft Power ও বাংলাদেশের অবস্থান

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *