NFT কী? উত্থান, পতন এবং সবচেয়ে বড় স্ক্যামের গল্প। NFT Explained in Bangla।

NFT কী — এই প্রশ্নটা এখন অনেকের মাথায় আসে, বিশেষ করে যখন শুনি একটি ডিজিটাল ছবি ১৩ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছে।”

মনে করুন আজ সকালে স্ক্রোল করতে করতে একটা ছবি চোখে পড়ল। হয়তো কোনো aesthetic artwork, হয়তো একটা মিষ্টি কার্টুন। দুই সেকেন্ড থামলেন। ভালো লাগলো।

এখন আপনার সামনে দুটো পথ। এক — রাইট ক্লিক, Save As, এবং ছবিটা নামিয়ে নিলেন। আথবা দুই — কোনো মার্কেটপ্লেস থেকে ৫ ডলার দিয়ে কিনে নিলেন, লাইসেন্সসহ।

সহজ দুনিয়া। সহজ সিদ্ধান্ত।

কিন্তু এবার একটু ঘুরিয়ে ভাবুন —

একই রকম একটা ডিজিটাল ছবি কেউ কিনলো ১৩ মিলিয়ন ডলারে!!!

হ্যাঁ। তেরো মিলিয়ন। এবং সেই ছবিটা? যে কেউ এখনো গুগলে সার্চ করলে দেখতে পাবে। ডাউনলোড করতে পারবে। ওয়ালপেপার বানাতে পারবে। কি অবাক লাগছে?

যদি তার সে ছবি, আমি অনলাইনে আরেকজনের কাছে দেখি, বা আরেকজনের মোবাইলে ওয়ালপেপার হিসাবে দেখি,  তাহলে সে আসলে কী কিনলো?

এখানেই আটকে যায় বেশিরভাগ মানুষ। কারণ আমরা সারাজীবন এটাই শিখেছি — কিছু কিনলে সেটা আমার হয়ে যায়। হাতে পাই, ঘরে রাখি, দেখাই।

কিন্তু ডিজিটাল দুনিয়ায় “মালিকানা” ব্যাপারটা ঠিক এভাবে কাজ করে না। একটা ছবি একসাথে কোটি জায়গায় থাকতে পারে। কেউ মুছতে পারে না, আটকাতেও পারে না।

তাহলে ১৩ মিলিয়ন ডলার খরচ করে আসলে কী পেল সে? ছবিটা না — সেটা তো সবার কাছেই আছে। সে পেল প্রমাণ। সে ছবিখানার মালিকানা দাবি করার একটা প্রমান পেল। কিভাবে?

এখানেই আসে NFT।

NFT বা Non-Fungible Token — নামটা একটু ভারী, কিন্তু ধারণাটা এক লাইনে বলা যায়: এটা একটা ডিজিটাল সনদ, Blockchain-এ লেখা, যেটা বলে — “এই নির্দিষ্ট সম্পদের আসল মালিক এই মুহূর্তে আপনি।”

ছবিটা সবাই দেখতে পারে। কিন্তু সেই ছবির অফিশিয়াল মালিক একজনই। আর সেই মালিকানার রেকর্ড এমন একটা জায়গায় লেখা, যেটা কেউ বদলাতে পারে না, মুছতেও পারে না।

সহজ কথায়? আপনি ছবি কিনছেন না — কিনছেন স্বীকৃতি। সেই স্বীকৃতির দাম নির্ধারণ করে বাজার। কখনো $৫। কখনো $১৩ মিলিয়ন।

এই ধারণাটা কতটা যুক্তিযুক্ত, কতটা উন্মাদনা — সেটা নিয়েই পরের আলোচনা।

Blockchain কী ? — সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা

NFT বুঝতে হলে আগে Blockchain বুঝতে হবে। এটি একটি ডিজিটাল খাতা যা পৃথিবীর হাজার হাজার কম্পিউটারে একই সাথে সংরক্ষিত থাকে। কেউ যদি একটি কপিতে কিছু বদলাতে চায়, তবে বাকি সবাই তা টের পায় এবং পরিবর্তনটি বাতিল হয়ে যায়।

 আরও সহজ করে বললে: ভাবুন একটা Google Doc, যেটা সবাই পড়তে পারে। কিন্তু কেউ — এমনকি Google নিজেও — একটা অক্ষর মুছতে বা বদলাতে পারবে না। এটাই মূলত Blockchain।

 এর তিনটি মূল বৈশিষ্ট্য:

  • বিকেন্দ্রীভূত (Decentralized): কোনো একক কর্তৃপক্ষের হাতে নিয়ন্ত্রণ নেই।
  • স্বচ্ছ (Transparent): যে কেউ যেকোনো লেনদেন যাচাই করতে পারে।
  • অপরিবর্তনীয় (Immutable): একবার লেখা হলে মোছার কোনো পথ নেই।

Ethereum কী এবং কীভাবে কাজ করে?

NFT বুজতে হলে আরেকটা জিনিস আমাদের পরিচিত হতে হবে। আর সেটা হল  ২০১৫ সালে চালু হওয়া Ethereum। এটি মূলত একটি বৈশ্বিক কম্পিউটারের মতো — যেখানে যে কেউ প্রোগ্রাম লিখতে ও চালাতে পারে। এটি তৈরি করেছিলেন ১৯ বছর বয়সী প্রোগ্রামার Vitalik Buterin। এটি ২ ভাবে কাজ করে

  • Smart Contract: এটি একটি স্ব-কার্যকর কোড যা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে নিজেই কাজ করে।
  • Gas Fee: নেটওয়ার্কের প্রতিটা কাজের জন্য নিজস্ব মুদ্রা ETH (Ether)-এ ফি দিতে হয়।

Bitcoin বনাম Ethereum — মূল পার্থক্যটা কোথায়?

নিচে আমরা একটি টেবিলের দিকে নজর দিবো ২টার বুজার সুবিধার্থে

বিষয়Bitcoin (BTC)Ethereum (ETH)
মূল উদ্দেশ্যডিজিটাল মুদ্রা (Digital Gold হিসেবে পরিচিত)প্রোগ্রামযোগ্য প্ল্যাটফর্ম (Smart Contracts এর জন্য)
Smart Contractসীমিত ক্ষমতাপূর্ণ সুবিধা এবং ফ্লেক্সিবিলিটি
NFT সাপোর্টসরাসরি নয় (অর্ডিনালসের মাধ্যমে সম্ভব)হ্যাঁ, মূলত এখানেই অধিকাংশ NFT তৈরি হয়
সর্বোচ্চ সরবরাহ২১ মিলিয়ন (নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ)কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই (Inflationary/Deflationary মেকানিজম)
শক্তি খরচঅনেক বেশি (Proof of Work)২০২২-এর পর ৯৯% কমেছে (Proof of Stake)
   

 Bitcoin = মূলত ডিজিটাল অর্থ। একটাই কাজ — এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মূল্য পাঠানো  Ethereum = একটা প্রোগ্রামযোগ্য মঞ্চ। এখানে নতুন টোকেন বানানো যায়, গেম চালানো যায়, চুক্তি সম্পাদন করা যায় — এবং NFT কেনা বেচা করা যায়।

NFT কী? Non-Fungible Token ব্যাখ্যা

Non-Fungible মানে হলো অদলবদল অযোগ্য। আপনার ১০০ টাকার নোট আমার ১০০ টাকার নোটের সাথে বদলানো যায় (Fungible), কিন্তু মোনালিসার অরিজিনাল ছবিটির বদলে অন্য ছবি নিলে তা সমান হয় না (Non-Fungible)। এটা হল NFT।

 মূল কথা

NFT কী? NFT হলো একটা ডিজিটাল মালিকানার সনদ — Blockchain-এ স্থায়ীভাবে নথিভুক্ত। কেউ কিনলে Blockchain-এ লেখা হয়: ‘এই আইটেমটি এই মুহূর্তে এই ব্যক্তির।’ সেটা জাল করা বা মুছে ফেলা, কমপক্ষে তাত্ত্বিকভাবে, অসম্ভব।

NFT তৈরির প্রক্রিয়াকে বলে Minting। একজন শিল্পী তার ছবি বা ভিডিও Ethereum-এ Smart Contract-এর মাধ্যমে নথিভুক্ত করেন। সেটা একটা অনন্য Token ID পায়। এরপর থেকে সেটা কেনা, বেচা, সংগ্রহ করা যায় — প্রতিটা লেনদেন Blockchain-এ সংরক্ষিত হতে থাকে।

যে ভুলটা সবাই করেছিল: NFT কিনার পরেও সবার একটা বিষয়ে নজরে আসে। যে ছবি সে NFT দিয়ে কিনেছে, সেম ছবি বাকিরাও ব্যবহার করতে পারছে সেটি না কিনেই। আকানে সবচেয়ে বড় confuse ছলে আসে।   NFT কিনলে আপনি ছবির মালিক হন না। আপনি পান শুধু সেই সনদের মালিকানা। Copyright শিল্পীর কাছেই থাকে — যদি চুক্তিতে আলাদা উল্লেখ না থাকে। মূল ছবিটাও সাধারণত Blockchain-এ নয়, একটা আলাদা সার্ভারে থাকে। এই পার্থক্যটা না বোঝার কারণে অনেকে পরে ভীষণ হতাশ হয়েছিলেন। তবে NFT কেবল ছবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি গারি, বারি, এমনকি সম্পদ কেনাবেচাতেও বাবহার হত।

NFT-এর উত্থান — $৮২ মিলিয়ন থেকে $১৭ বিলিয়ন

২০২০ আর ২১ সালের সেই সময়টার কথা ভাবুন। চারদিকে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। কেন হঠাৎ এই NFT নিয়ে এত মাতামাতি শুরু হলো? আসলে কয়েকটা ঘটনা ঠিক একই সময়ে ঘটেছিল। কোভিড তখন আমাদের ঘরে বন্দি করে ফেলেছে, হাতে অফুরন্ত সময়। অন্যদিকে সরকারগুলো অর্থনীতি সচল রাখতে বাজারে দেদারসে টাকা ঢালছে, আর ব্যাংকের সুদের হারও একদম নিচে। ফলে মানুষের হাতে যেমন অলস টাকা ছিল, তেমনি ছিল ঝুঁকি নেওয়ার মতো এক দুঃসাহসী মানসিকতা। NFT কী?

কিন্তু এই গল্পের শুরুটা কিন্তু অনেক আগে। ২০১৪ সালে যখন কেভিন ম্যাককয় মাত্র ৪ ডলারে প্রথম একটি ভিডিও ক্লিপ বিক্রি করেন, তখন কেউ ফিরেও তাকায়নি। মিডিয়া ছিল চুপচাপ, বিনিয়োগকারীরা ছিল উদাসীন। এরপর ২০১৭ সালে এল ‘ক্রিপ্টোকিটিস’ (CryptoKitties)—ভার্চুয়াল বিড়াল কেনাবেচার এক অদ্ভুত গেম। মানুষ এতটাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল যে ইথেরিয়াম নেটওয়ার্ক জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। তখনই প্রথম বোঝা গেল, ডিজিটাল জিনিসেরও একটা বড় বাজার হতে পারে।

আসল পাগলামিটা শুরু হলো ২০২১ সালের মার্চে। ডিজিটাল শিল্পী বিবল (Beeple) যখন তার একটি কাজ ৬৯.৩ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করলেন, তখন পুরো দুনিয়া নড়েচড়ে বসল। খবরের কাগজের হেডলাইন থেকে শুরু করে চায়ের কাপে ঝড়—সবার মুখে একই প্রশ্ন ছিল, “একটা ছবি বা ভিডিওর দাম কীভাবে কয়েকশো কোটি টাকা হয়?”

এরপর এল সেই বিখ্যাত ‘বোর্ড এপ ইয়ট ক্লাব’ (Bored Ape Yacht Club)। কয়েকটা কার্টুন বানরের ছবি, যা শুরুতে মাত্র ২০০ ডলারে পাওয়া যেত। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই জাস্টিন বিবার, এমিনেম বা স্নুপ ডগের মতো তারকারা যখন এগুলো কিনতে শুরু করলেন, তখন এটি রাতারাতি আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হলো। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, টুইটারের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ডরসির প্রথম টুইটটিই বিক্রি হয়ে গেল প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলারে!

২০২১ সালের শেষে দেখা গেল এক অবিশ্বাস্য চিত্র। যে বাজার ছিল মাত্র ৮২ মিলিয়ন ডলারের, এক বছরের মাথায় তা পৌঁছে গেল ১৭ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ প্রায় ২০,৬০০ শতাংশ বৃদ্ধি! ইতিহাসের পাতায় কোনো বাজার এত দ্রুত ফুলেফেঁপে উঠতে বোধহয় আগে কখনো দেখা যায়নি। মনে হচ্ছিল, সবাই যেন রাতারাতি আলাদিনের চেরাগ খুঁজে পেয়েছে।

NFT-এর পতনকীভাবে সব শেষ হলো

২০২২ সালের মে মাসের সেই সময়টা ছিল যেন একটা সাজানো তাসের ঘর ভেঙে পড়ার মতো। রাতারাতি না হলেও, যা ঘটেছিল তা ছিল অবিশ্বাস্য। দৈনিক NFT বিক্রি এক ধাক্কায় ৯২% কমে গেল। আসলে কোনো একটা বিশেষ কারণে নয়, বরং পাঁচটা বড় ধাক্কা একই সাথে এসে লেগেছিল এই বাজারে:

১. যখন মুদ্রার দামই হারিয়ে গেল: NFT কেনাবেচার মূল মাধ্যম হলো ইথেরিয়াম (ETH)। ২০২২ সালে যখন বিটকয়েন ৫৬% আর ইথেরিয়াম ৬৩% দাম হারালো, তখন স্বাভাবিকভাবেই NFT-এর ডলার মূল্যও তলিয়ে গেল। ক্রিপ্টো আর NFT—এই দুই বাজার আসলে একই সুতোয় গাঁথা; একটা ডুবলে অন্যটার ভেসে থাকা অসম্ভব ছিল।

২. ঝুঁকি নেওয়ার সাহস ফুরিয়ে আসা:

মহামারী পরবর্তী সময়ে যখন সব জিনিসের দাম বাড়তে শুরু করল, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়ে দিল। বিনিয়োগকারীরা আর ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। তারা তাদের টাকা নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে শুরু করলেন, আর সেই তালিকায় সবার আগে বলি হলো NFT।

৩. আবর্জনার ভিড়ে আসল হারিয়ে যাওয়া:

২০২১ থেকে ২২ সালের মধ্যে প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন NFT বাজারে আসতে লাগল। এর বেশির ভাগই ছিল তাড়াহুড়ো করে বানানো, যার কোনো শৈল্পিক বা বাস্তব মূল্য ছিল না। বাজারের জোগান চাহিদা ছাপিয়ে এত বেশি বেড়ে গিয়েছিল যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল আর নকল চেনা দায় হয়ে পড়েছিল।

৪. শেষ পেরেক ঠুকেদিল FTX:

২০২২-এর শেষ দিকে যখন বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ FTX দেউলিয়া হয়ে গেল, তখন মানুষের বিশ্বাস পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারলেন যে এই ডিজিটাল দুনিয়ায় তাদের সম্পদ মোটেও সুরক্ষিত নয়। এই ঘটনাটি ছিল কফিনে শেষ পেরেকের মতো।

৫. ফাঁকা বুলির অবসান:

মেটাভার্স, এক্সক্লুসিভ কমিউনিটি কিংবা ভবিষ্যতের নানা সুবিধার যে বড় বড় বুলি আওড়ানো হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা গেল খুব সামান্যই। যখন উন্মাদনা বা ‘হাইপ’ কমে গেল, তখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারল যে নিছক একটা ডিজিটাল ফাইলের জন্য এত টাকা ঢালার কোনো যুক্তি নেই।

সহজ কথায়, যে বেলুনটা অতিরিক্ত বাতাসে ফুলেফেঁপে উঠেছিল, এই পাঁচটি ধাক্কায় তা সশব্দে ফেটে গেল। কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে দিনশেষে মানুষের হাতে রয়ে গেল কেবল মূল্যহীন কিছু ডিজিটাল ছবি।

একই জিনিস হচ্ছিলো বাকি NFT token বা কার্যত প্রোজেক্টগুলোর সাথে। যার ফলে যে NFT সবার চোখে আশা ছিল, তা নিমিষে ভেঙ্গে যায়। NFT কী?

সেলিব্রিটিরা এই ঝড়ে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন? সেই সংখ্যাগুলো শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে:

  • Justin Bieber: ১.৩ মিলিয়ন ডলারে কেনা তার সেই বিখ্যাত ‘Bored Ape’ ছবিটির দাম এখন নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২,৮০০ ডলারে।
  • Eminem: তিনি ৪৬০,০০০ ডলারে যে NFT কিনেছিলেন, বর্তমানে সেটি প্রায় মূল্যহীন।
  • Jack Dorsey: তার যে প্রথম টুইটটি ২.৯ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়েছিল, সেটির বর্তমান বাজারমূল্য মাত্র ১৪,০০০ ডলার।
  • Logan Paul: তিনি ৬২৩,০০০ ডলারে যে NFT কিনেছিলেন, তার দাম এখন কমে হয়েছে মাত্র ১২০ ডলার।

সহজ কথায়, যে তারকারা ভেবেছিলেন ডিজিটাল দুনিয়ার এই সম্পদে বিনিয়োগ করা মানেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত, তারাও এই ধসে সাধারণ মানুষের মতোই সর্বস্ব হারিয়েছেন। নামিদামি তারকাদের এই দশা দেখে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও তখন বুঝতে পেরেছিলেন যে হাইপ আর বাস্তবতা এক নয়।

কেন NFT-কেইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় স্ক্যামবলা হয়?

অবশ্যই, আপনার দেওয়া এই অংশটুকু অতিরিক্ত স্পেস কমিয়ে এবং আগের মতো সহজ ও সাবলীল ভাষায় নিচে সাজিয়ে দিচ্ছি:

সব NFT কিন্তু আদতে স্ক্যাম ছিল না—এটা আমাদের মনে রাখা জরুরি। কিন্তু প্রতারণার মাত্রা এতটাই ছিল যে, ভালো-মন্দ মিলিয়ে গোটা বাজারের সুনামই ধুলোয় মিশে গেছে। মানুষ ঠিক কীভাবে এই ফাঁদে পড়েছিল? চলুন সেই অন্ধকার দিকগুলো একটু সহজভাবে দেখা যাক:

১. রাগপুল (Rug Pull): যখন পায়েরনিচের মাটি সরে যায়

স্ক্যামাররা প্রথমে খুব আকর্ষণীয় প্রজেক্ট আর বড় বড় সব স্বপ্নের কথা শোনাত। লক্ষ লক্ষ ডলার বিনিয়োগ আসার পর তারা রাতারাতি উধাও হয়ে যেত। ওয়েবসাইট বন্ধ, ডিসকর্ড সার্ভার ডিলিট—সব শেষ। যেমন ২০২২ সালের ‘Frosties NFT’ প্রজেক্টটি ১.৩ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়েছিল। পরে দুই হোতাকে ধরা সম্ভব হলেও বিনিয়োগকারীরা তাদের টাকা আর ফেরত পাননি।

২. ওয়াশট্রেডিং(Wash Trading): নিজেই নিজের ক্রেতা

বাজারের চাহিদা অনেক বেশি—এটা দেখানোর জন্য বিক্রেতারা তাদের আলাদা আলাদা ওয়ালেট থেকে নিজের NFT নিজেই কিনতেন। সাধারণ মানুষ এই ভুয়া চাহিদা বা ‘হাইপ’ দেখে চড়া দামে সেগুলো কিনতেন, আর কেনা শেষ হতেই দাম পড়ে যেত। চেইনঅ্যানালাইসিসের তথ্যমতে, এক বছরেই এভাবে প্রায় ৯ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

৩. তারকাদের ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’:

অনেক নামিদামি তারকাকে টাকা দিয়ে প্রজেক্টের প্রচারণা করানো হতো, কিন্তু তারা যে এর বিনিময়ে টাকা নিয়েছেন তা গোপন রাখা হতো। তারা বাজারে উত্তেজনা তৈরি করতেন, আর সাধারণ মানুষ যখন বিনিয়োগ শুরু করত, তখন তারা নিজেদের কাছে থাকা টোকেনগুলো চুপচাপ চড়া দামে বিক্রি করে বেরিয়ে যেতেন। সাধারণ ক্রেতারা তখন মাঝপথে আটকে পড়তেন। পরে SEC লিন্ডসে লোহান, জেইক পল বা একন-এর মতো অনেক তারকার বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত করেছিল।

৪. শিল্পকর্ম চুরি

প্রতারকরা অন্যের আঁকা ছবি বা ভিডিও নিজের নামে NFT করে বিক্রি করত। এমনকি ডিজিটাল শিল্পী কিং হান (Qing Han) ২০২০ সালে মারা যাওয়ার পর তার পরিবারের অনুমতি ছাড়াই তার কাজগুলো NFT হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। যেহেতু কোনো কেন্দ্রীয় যাচাই ব্যবস্থা ছিল না, তাই এসব রুখে দেওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল।

৫. ফিশিং ও হ্যাকিং:

ভুয়া ওয়েবসাইট আর লিংকের মাধ্যমে এক বছরে প্রায় ১০০ মিলিয়নের বেশি মূল্যের NFT চুরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল ‘Axie Infinity’-র রনিন ব্লকচেইন হ্যাক হওয়া, যেখান থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার চুরি হয়। পরে জানা যায়, এর সাথে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের যোগসূত্র ছিল। NFT কী?

২০২৬ সালে এসে দাঁড়িয়ে আজ অবস্থা কী?

বাস্তবতা বেশ নিষ্ঠুর। গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৩,২৫৭টি NFT সংগ্রহের মধ্যে ৬৯,৭৯৫টির বাজারমূল্য এখন একদম শূন্য। প্রায় ৯৬% NFT-কে এখন ‘মৃত’ বলা যায়। একটা গড়পড়তা NFT কালেকশন বড়জোর ১ বছরের কিছু বেশি সময় টিকে থাকে, যা সাধারণ ক্রিপ্টো প্রজেক্টের তুলনায় অনেক কম।

শেষ কথা:

NFT প্রযুক্তি নিজে কোনো স্ক্যাম ছিল না। ব্লকচেইনে ডিজিটাল মালিকানা নিশ্চিত করার ধারণাটি বেশ আধুনিক এবং সম্ভাবনাময়। মূল সমস্যা ছিল একে ঘিরে তৈরি হওয়া সংস্কৃতি—ভুয়া প্রতিশ্রুতি, তারকাদের অন্ধ অনুসরণ আর দ্রুত বড়লোক হওয়ার নেশা। যখন এই মোহ কেটে গেল, তখন দেখা গেল মানুষের হাতে পড়ে আছে কেবল কিছু মূল্যহীন ডিজিটাল ফাইল। প্রযুক্তির চেয়ে মানুষের লোভই এই বাজারকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গেছে।

আরও পড়ুনঃ Attention Economy: দিনে ৮০ বার ফোন চেক করে আপনি যে ট্রিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি চালাচ্ছেন | Bangladesh

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *