প্রবৃদ্ধির গল্প, পকেট ফাঁকা: বাংলাদেশের অর্থনীতি কি সত্যিই এগিয়ে যাচ্ছে?
রফিকুল ইসলাম ঢাকার মিরপুরে থাকেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। মাস শেষে বেতন আসে ২৮ হাজার টাকা। স্ত্রী গৃহিণী, দুটো সন্তান — একজন কলেজে পড়ে, একজন স্কুলে। বছর পাঁচেক আগেও তিনি মাসের মাঝামাঝি সামান্য সঞ্চয় করতে পারতেন। এখন মাসের শেষ সপ্তাহে কোনো একটা বিল বাকি রাখতে হয়। চালের দাম বেড়েছে, ডিমের দাম বেড়েছে, বাসাভাড়া বেড়েছে, সন্তানের কোচিং ফি বেড়েছে। কিন্তু বেতন? সেটা সেই আগের জায়গাতেই প্রায় থমকে আছে।
রফিকুল সাহেব একা নন। বাংলাদেশে কোটি কোটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্পটা এখন মোটামুটি এরকমই। একদিকে সরকার বলছে GDP বাড়ছে, পদ্মা সেতু হয়েছে, মেট্রোরেল চলছে। অন্যদিকে রান্নাঘরের বাজেটে টান পড়ছে, সন্তানের পড়ার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এই দুটো বাস্তবতা কি একসাথে সত্যি হতে পারে? হ্যাঁ, পারে। আর সেখানেই বাংলাদেশের অর্থনীতির আসল প্রশ্নটা লুকিয়ে আছে।
GDP বাড়ছে, কিন্তু সেটা কার কাজে লাগছে?
বাংলাদেশ গত দেড় দশকে ধারাবাহিকভাবে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে GDP প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে — এটা নিঃসন্দেহে একটা বড় সাফল্য। কিন্তু GDP সত্যিই মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিমাপ করে? GDP হলো মোট উৎপাদনের পরিমাপ — কিন্তু সেই উৎপাদনের সুফল কে পাচ্ছে, কীভাবে পাচ্ছে, সেটা GDP বলে না। তার মানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আসল খেলাটা কিন্তু এখানে না।
মূল্যস্ফীতির কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। ২০২৩ সালে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কোনো কোনো মাসে ১২ শতাংশের উপরে উঠেছে — বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর তথ্য অনুযায়ী। Nominal আয় বাড়লেও real আয় — অর্থাৎ ক্রয়ক্ষমতা — আসলে কমেছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে আয় বৈষম্য (Gini coefficient) গত এক দশকে বেড়েছে — প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে বিতরণ হচ্ছে না।

সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬: প্রফ. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকার এবং একটি জর্জর অর্থনীতির সত্য প্রতিছবি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। জুলাইয়ের শিক্ষার্থী আন্দোলন তখন গণঅভ্যুথানে রূপ নিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হয়েছে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট, নোবেলবিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে। তাত্ত্বিক দিক থেকে এটা রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুহূর্ত। কিন্তু অর্থনীতির দিক থেকে ও এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেন্জের সময়গুলোর একটি।
মূল্যস্ফীতি: জুলাই ২০২৪-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১১.৬০ শতাংশে পৌঁছেছিল ,খাদ্য মূল্যস্ফীতি সে মাসে ১৪.১০ শতাংশে পৌঁছেছিল
The Conversation-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তুলনামূলক ভাবে এটি বাংলাদেশের ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল। আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলতা, ভাঙা সরবরাহ চেইন, ফ্যাক্টরি বন্ধ — সব মিলিয়ে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়েছিল। নভেম্বর ২০২৪-এ মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছিল ১১.৩৮ শতাংশ। ডিসেম্বরে Daily Star-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রফ. ইউনুস নিজেই স্বীকার করেন যে মূল্যস্ফীতি খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণে তার সরকার কাজ করছে।
GDP প্রবৃদ্ধির ধস: বিশ্বব্যাংক প্রথমে ২০২৪ সালের এপ্রিলে ৫.৭% প্রবৃদ্ধি অনুমান করেছিল। অক্টোবরে সেটা প্রথমে ৪% তে নামিয়ে আসে, তারপর ৩.৮% এ নামে। জানুয়ারি ২০২৫-তে নবতম সংশোধনে বিশ্বব্যাংক তার হিসাব নামিয়ে আনে ৩.৩% তে — তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম। IMF-র অনুমান ছিল 3.8%।
পোশাক শিল্পের বিপর্যয়: রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলতার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে পোশাক খাত। ৫ আগস্টের পরপরই আওয়ামী লিগের সঙ্গে যুক্ত অনেক ফ্যাক্টরি মালিক দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান অথবা ঢাকার অলিগলিতে পালিয়ে যান। তাদের কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। BGMEA-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৭০+টি BGMEA-ভুক্ত রেডিমেড গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়েছে, ফলে ৫০,000-এরও বেশি শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। BEXIMCO-র ১৫টি কারখানা থেকেই ৪০০০০ শ্রমিক কাজ হারান।
রিজার্ভ: শেষ হাসিনা সরকারের শেষ দিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ (IMF BPM-6 পদ্ধতি) ২০২১ সালের $৪৮ বিলিয়ন থেকে নেমে আসতে আসতে ২০২৪ সালের অক্টোবরে $১৯.৮ বিলিয়নের নিচে নেমে যায় — Xinhua News। মাত্র দু মাসের আমদানি দায় মেটানোর মত রিজার্ভ বাকি ছিল না। L/C খুলতে ব্যাংকগুলো হিমশিম খাচ্ছিল। ডলার সংকটে আমদানিকারকরা পণ্যের জন্য কাঁচামাল আমদানি করতে পারছিল না। উৎপাদন থেমে গিয়েছিল। এ কঠিন সময়েও অন্তর্বর্তী সরকার চেষ্টা করে অর্থনীতি ঠিক রাখার।
রেমিট্যান্স সারপ্রাইজ: তারপরও এই সংকটকালীন সময়ের মধ্যেই একটা উজ্জ্বল চিত্র ফুটে ওঠে রেমিট্যান্স প্রবাহে। অন্তর্বর্তী সরকার হুন্ডি চ্যানেলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় বাড়তে শুরু করে। FY2024-25-এ রেমিট্যান্স পৌঁছায় $৩০বিলিয়নেরও বেশি — বাংলাদেশের ইতিহাসের ব্যাংকিং চ্যানেলে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। আগের রেকর্ড $২৪.৭৭ বিলিয়ন (২০২০-২১) সালের রেকর্ড সাতগুণ বেড়ে গেছে। শুধু মার্চ ২০২৫ মাসেই এসেছে $৩.৯৭ বিলিয়ন — এক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স।

IMF ও বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা: ডিসেম্বর ২০২৪-এ IMF দল কুর্শের সাথে staff-level agreement-এ পৌঁছায় — IMF-এর রিলিজতে বলা হয়, “সময়মতো অন্তর্বর্তী সরকার গঠন অর্থনীতি স্বাভাবিকবীকরণে সহায়তা করেছে।” FY25-এ GDP প্রবৃদ্ধি .৩.৮% নামনোর প্রক্ষেপণ দিলেও বিশ্বব্যাংক সেসময় banking reform, budget support, এবং revenue sector reform-এ $৫ বিলিয়ন ওপরে ওরণ পাঠান।
বেসরকারি বিনিয়োগ সংকোচ: রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ফলে জানুয়ারি ২০২৫-তে বেসরকারি খাতে ওরণ প্রবৃদ্ধি নামে ৭.১৫%-এ, এক দশকের সর্বনিম্ন। বিনিয়োগকারিরা নির্বাচনের অপেক্ষায় বসে ছিলেন, নতুন বিনিয়োগ থমকে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ, গ্যাস, ব্যাংক ওরণ-সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাাড়াতে শিল্পের অবস্থান সংকুচিত হয়েছিল।
ব্যাংকিং সংস্কার: এই চ্যালেন্জিং সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক সংস্কারে কিছু সাহসি পদক্ষেপ নেয়। রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত ১১টি ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়, ৬টি ব্যাংকে Asset Quality Review (AQR) শুরু হয়। NPL অর্থের নতুন classification standard (৯০ দিন) আনা হয়, যদিও তা পরবর্তীতে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৪ এ NPL-র পরিমাণ দাঁড়িয়েছে $২৮.৫৭ বিলিয়নে। এছাড়াও ইসলামি ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট মোকাবেলা করার জন্য সবগুলি ব্যাংককে একটা আলাদা বোর্ড অফ অর্ডারে নিয়ে আসা হয়। যেমন GIB, ISB, Exim Bank সহ বেশকিছু ব্যাংককে অডিট করে সমাধানের পথ খুলে দেয়া হয়। হাসিনা পালিয়ে যাওযার পর ইসলামী ব্যাংক এবং সরকারি ব্যাংক গুলোর তারল্য সংকটে পড়ে যাই।
সর্বমিলিয়ে, আমরা যদি সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৫-এর সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি সরকার যেভাবে হ্যান্ডেল করেছিল,অনেকগুলোর সমস্যার মাঝেও আন্দোলনের পরের অবস্থা, ডলার সংকট, উদ্যোক্তাশূন্য শিল্প, বাড়তি মূল্যস্ফীতি, এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ত্রিরাশির মধ্যে, তাতে দেরবছর মেয়াদী সরকারের জন্য অনেক। ইতিবাচক দিকে রেমিট্যান্স বিসফোরণ, বিশ্বব্যাংক ও IMF-এর প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন, এবং রিজার্ভ বাড়া স্পষ্ট সাফল্য। নেতিবাচক দিকে মূল্যস্ফীতি বিনিয়োগহার ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেশের সাধারণ মানুষের উপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছিল।
ব্যাংক ব্যবস্থার ভেতরে জং ধরছে
একটি দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হলো তার ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে যে উদ্বেগ, সেটা এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়। দিসেম্বার ২০২৪ পর্যন্ত মোট NPL দাঁড়িয়েছে $২৮.৫৭ বিলিয়নে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। বড় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক সংযোগ আছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো সহজে ওরণ পাচ্ছে। কিন্তু SME খাতের উদ্যোক্তারা জামানত ও কাগজপত্রের জটিলতায় ওরণ পাচ্ছেন না। The Financial Express-এর প্রতিবেদন বলছে, SME প্রবাহ লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকছে।

বাজার কি আসলে বাজার, নাকি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে?
২০২৩ সালে পেঁয়াজের দাম তিনমাসে তিনগুণ হয়ে কেজিতে ২৫০ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। শুধু পেঁয়াজ না, কাঁচামরিচ সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল জিনিসের দাম আকাশচুম্বী ছিল। বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন, বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার প্রতিযোগিতামূলক নয়। কৃষক থেকে পাইকার, পাইকার থেকে আড়তদার, আড়তদার থেকে খুচরো বিক্রেতা — প্রতিটি স্তরে দাম যোগ হয়। মাঝখানে একটা অদৃশ্য সিন্ডিকেট কাজ করে যারা দাম নিয়ন্ত্রণে অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ। তারা দাম নিয়ন্ত্রণ করে, এবং সে দামে সাধারন মানুষজন কিনতে বাধ্য থাকে। সরকার মুলুত তাদের থামাতে ব্যর্থ। কেননা সরকারের ভিতরে থাকা লোকেরাও এ সিন্ডিকেটের সাথে মিলিত থাকে।
Prothom Alo-তে প্রকাশিত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাসের পর রাজধানীতে পৌঁছাতে দাম কীভাবে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সরকারের সদিচ্ছা এবং প্রশাসনের কঠোর আইনের অভাবে দাম বেড়ে যায়।
রপ্তানির একটাই পথ — এটা কতটা নিরাপদ?
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৬০% এরও বেশি আসে তৈরি পোশাক (RMG) খাত থেকে। এতো নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সংকটে তা বোঝা গেছে। বড় বেসরকারি কনগ্লোমারেট Beximco-র ১৫টি কারখানা থেকে ৪০০০০ শ্রমিক চাকরি হারান। পরবর্তীতে McKinsey Global Institute-এর গবেষণা অনুসারে, আগামী দশকে পোশাক শিল্পে automation-এর বড় চাপ আসবে। ফার্মা, চামড়া, পাট — এগুলো সম্ভাবনাময় হলেও রপ্তানি বিন্যাসে বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি।

শ্রমবাজারে সংখ্যা আছে, মান কি আছে?
বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ তরুণ — এটাকে বলা হয় demographic dividend। কিন্তু BIDS-এর গবেষণা বলছে, দেশে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার অশিক্ষিতদের তুলনায় বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া গ্র্যাজুয়েটদের একটা বড় অংশ চাকরির বাজারে কাঙ্খিত দক্ষতা নিয়ে আসতে পারছেন না।
জলবায়ু পরিবর্তন: যে ক্ষতি GDP-তে দেখা যায় না
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে Climate Vulnerability Index-এ এটি বারবার শীর্ষ পাঁচে থাকে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি — প্রতি বছরই এই ক্ষতিগুলো কৃষিজমি, বসতবাড়ি এবং অবকাঠামো নষ্ট করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। মানুষ শহরে আসছে, কিন্তু শহরে তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান বা আবাসন নেই।
শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা: নীতি আছে, প্রয়োগ কোথায়?
Transparency International Bangladesh (TIB)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে নাগরিকদের এখনও দুর্নীতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিনিয়োগকারিরা বলছেন, তাদের বিনিয়োগ করতে কষ্ট হচ্ছে। দেশের tax-to-GDP ratio দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্নের কাছাকাছি মাত্র ৭-৮%, যেখানে ভারতের ১৭-১৮% এই সংকীর্ণ রাজস্ব ভিত্তি সরকারের বিনিয়োগ ও সামাজিক সুরক্ষার সক্ষমতাকে সীমিত করে রাখছে। এছাড়াও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এ অঞ্চলে একটা বিরূপ পরিবেশ বজায় রাখে। জনমনে দেশীয় রাজনীতি এবং নীতি নির্ধারক নিয়ে সবসময় অভিযোগ থাকে। হরতাল, হাঙ্গামা, ছাত্ররাজনিতি, আইনের দুর্বল শাসন, জবাবদিহিতার অভাব, এসবের কারণে জনগণ ও সরকারের মাঝে একটা দুরুত্ব সৃষ্টি হয়।
তাহলে বাংলাদেশের সামনে কী আছে?
এই প্রশ্নের একটি সহজ উত্তর দেওয়া সম্ভব নয় — এবং দেওয়াটাও সৎ হবে না।
একদিকে আছে সম্ভাবনা, যেখানে বিশাল তরুণ জনশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থানের কৌশলগত সুবিধা, রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ, পোশাক শিল্পে প্রমাণিত দক্ষতা, এবং ডিজিটাল অর্থনীতি -তে প্রবেশের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা আছে।
অন্যদিকে আছে কাঠামোগত দুর্বলতা। ব্যাংক খাতের খেলাপি লনে সংকট, বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব, রপ্তানির অতি-নির্ভরতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান চাপ, এবং প্রবৃদ্ধির সুফল বণ্টনের অসমতা।

রফিকুল সাহেবের মতো লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিনের হিসাবে এই দুটো বাস্তবতার মধ্যে বেঁচে আছেন। তারা GDP-র পরিসংখ্যান পড়েন না, কিন্তু চালের দামটা ঠিকই অনুভব করেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতি কি শুধু বাড়ছে, নাকি সত্যিকার অর্থে উন্নত হচ্ছে? প্রবৃদ্ধির গল্পটা কি টেকসই, নাকি ভেতরে ভেতরে ফাটল ধরছে? অন্তর্বর্তী সরকারের এসময় আনা সংস্কারগুলো কি বাস্তবে রূপ নিছ্ছে, নাকি শুধু কাগজে থাকছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করে আগামী কয়েক বছরে কোন পথে হাঁটা হয় — তার উপর।
আর সেই পথ বেছে নেওয়ার দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়, নীতিনির্ধারকদের নয় — এটা একটা সমাজের সম্মিলিত প্রশ্ন, যার উত্তর আমাদের সবাইকে মিলেই খুঁজতে হবে।
আরও পড়ুনঃ একটি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদলানো কি শুধু তত্ত্ব, নাকি বাস্তব?

